দারসুল কুরআন - সূরা আল যিলযাল - আমার প্রিয় বাংলা বই

সাম্প্রতিকঃ

Post Top Ad

Responsive Ads Here

October 13, 2026

দারসুল কুরআন - সূরা আল যিলযাল

 


দারসুল কুরআনঃ সূরা আল যিলযাল 

তেলাওয়াত ও অনুবাদ:

إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا

১। যখন পৃথিবী তার চূড়ান্ত কম্পনে প্রবলভাবে কেঁপে উঠবে।

وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا

২। এবং পৃথিবী তার ভেতরের সমস্ত বোঝা বের করে দেবে।

وَقَالَ الْإِنسَانُ مَا لَهَا

৩। আর মানুষ বলবে, এর কী হলো?

يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا

৪। সেদিন পৃথিবী তার সমস্ত সংবাদ প্রকাশ করবে।

بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَىٰ لَهَا

৫। কারণ তোমার রব তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।

يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِّيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ

৬। সেদিন মানুষ বিভিন্ন দলে বের হবে, যাতে তাদের নিজেদের আমল তাদের দেখানো হয়।

فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ

৭। অতএব কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলেও সে তা দেখতে পাবে।

وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ

৮। আর কেউ অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করলেও সে তা দেখতে পাবে।

সূরার নাম:

    §  সূরা আল যিলযাল।

    §  আরবী: الزلزلة

    §  অর্থ: প্রচণ্ড কম্পন বা ভূমিকম্প

    §  সূরা নম্বর: ৯৯

    §  আয়াত সংখ্যা: ৮

    §  পারা: ৩০

 নামকরণ:

    সূরার প্রথম আয়াতে বলা হয়েছেঃ

إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا

অর্থঃ যখন পৃথিবী তার চূড়ান্ত কম্পনে প্রবলভাবে কেঁপে উঠবে।

এই আয়াতে ব্যবহৃত ‘যিলযাল’ শব্দ থেকেই সূরাটির নাম "সূরা আল যিলযাল" রাখা হয়েছে। ‘যিলযাল’ অর্থ প্রচণ্ড কম্পন বা প্রবলভাবে কেঁপে ওঠা।

শানে নুযুল:

    সুরা আল যিলযাল মক্কার প্রাথমিক যুগে এমন সময় নাযিল হয় যখন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও হৃদয়গ্রাহী পদ্ধতিতে ইসলামের বুনিয়াদি আকীদা-বিশ্বাস মানুষের সামনে পেশ করা হচ্ছিল।

সূরার বিষয়বস্তু:

    সূরা আল যিলযালে মূলতঃ কিয়ামতের দিনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে।

    প্রথমে পৃথিবীর প্রচণ্ড কম্পনের কথা বলা হয়েছে। এরপর পৃথিবীর ভেতরের বিষয় প্রকাশ পাওয়া, মানুষের বিস্ময়, পৃথিবীর মানুষের কর্মকাণ্ডের সাক্ষ্য দেওয়া এবং আল্লাহর নির্দেশে পৃথিবীর সেই সাক্ষ্য প্রকাশ করার কথা এসেছে। এরপর মানুষকে তার নিজের আমল দেখানো হবে এবং শেষ দুটি আয়াতে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে-অতি সামান্য ভালো ও মন্দ কাজও হিসাবের বাইরে যাবে না।

ব্যাখ্যা:

আয়াত-১

إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا যখন পৃথিবী তার চূড়ান্ত কম্পনে প্রবলভাবে কেঁপে উঠবে।

    §  সূরার শুরুতেই আল্লাহ কিয়ামতের একটি ভয়াবহ দৃশ্য আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। পৃথিবী আজ মানুষের কাছে স্থির ও নিরাপদ মনে হলেও কিয়ামতের দিন তার বর্তমান অবস্থা থাকবে না। পৃথিবী এমনভাবে কেঁপে উঠবে, যা হবে মানুষের পরিচিত কোনো ভূমিকম্পের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

    §  আল্লাহ অন্যত্র বলেনঃ

﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ ۚ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ﴾

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। নিশ্চয় কিয়ামতের প্রকম্পন এক মহা ভয়ংকর বিষয়।” (সূরা আল-হাজ্জঃ ১)

    §  আরও বলা হয়েছেঃ

﴿يَوْمَ تَرْجُفُ ٱلْأَرْضُ وَٱلْجِبَالُ وَكَانَتِ ٱلْجِبَالُ كَثِيبًۭا مَّهِيلًا﴾

    “যেদিন পৃথিবী ও পাহাড়সমূহ কেঁপে উঠবে এবং পাহাড়গুলো হয়ে যাবে বালুর স্তূপের মতো।” (সূরা আল-মুযযাম্মিলঃ ১৪)

    §  অর্থাৎ কিয়ামতের দিন পৃথিবীর বর্তমান স্থিরতা সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। মানুষ তখন বুঝতে পারবে, দুনিয়ার যে ব্যবস্থাকে সে স্থায়ী মনে করেছিল, তা আসলে চিরস্থায়ী নয়।

আয়াত-২

وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا এবং পৃথিবী তার ভেতরের সমস্ত বোঝা বের করে দেবে।

    §  কিয়ামতের সময় পৃথিবী তার ভেতরে থাকা বিষয়গুলো প্রকাশ করে দেবে। মুফাসসিরদের ব্যাখ্যায় এর মধ্যে মৃতদের কবর থেকে বের হয়ে আসার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

    §  মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায় না। বরং মৃত্যুর পর রয়েছে পুনরুত্থান এবং আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়া।

    §  আল্লাহ বলেন:

﴿ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ﴾

    “তারপর তোমরা অবশ্যই কিয়ামতের দিন পুনরুত্থিত হবে।” (সূরা আল-মুমিনূনঃ ১৬)

    §  আরও বলেন:

﴿وَأَنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ لَّا رَيْبَ فِيهَا وَأَنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ مَن فِي الْقُبُورِ﴾

    “এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ কবরসমূহে যারা আছে তাদের পুনরুত্থিত করবেন।” (সূরা আল-হাজ্জঃ ৭)

    §  সুতরাং মানুষ যতই মৃত্যুকে জীবনের শেষ মনে করুক না কেন, আল্লাহর ঘোষণা হলো-একদিন প্রত্যেক মানুষকে পুনরায় উঠতে হবে এবং তার রবের সামনে দাঁড়াতে হবে।

আয়াত-৩

وَقَالَ الْإِنسَانُ مَا لَهَا আর মানুষ বলবে, এর কী হলো?

    §  পৃথিবীর এমন অভূতপূর্ব পরিবর্তন দেখে মানুষ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করবে-পৃথিবীর এমন কী হলো?

    §  যে পৃথিবীতে মানুষ নিশ্চিন্তে জীবন কাটিয়েছে, যাকে সে নিজের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও জীবনের ভিত্তি মনে করেছে, সেই পৃথিবী যখন অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হবে, তখন মানুষের আতঙ্ক ও বিস্ময় প্রকাশ পাবে।

    §  আল্লাহ কিয়ামতের আরেকটি দৃশ্য বর্ণনা করে বলেন:

﴿يَوْمَ يَكُونُ ٱلنَّاسُ كَٱلْفَرَاشِ ٱلْمَبْثُوثِ﴾﴿وَتَكُونُ ٱلْجِبَالُ كَٱلْعِهْنِ ٱلْمَنفُوشِ﴾

    “সেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো এবং পাহাড় হবে ধুনিত পশমের মতো।” (সূরা আল-কারিয়াহঃ ৪–৫)

    §  অর্থাৎ সেদিন পৃথিবীর পরিচিত পরিবেশ, মানুষের স্বাভাবিক জীবন এবং বর্তমান নিয়ম-সবকিছুই বদলে যাবে।

আয়াত-৪

يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا সেদিন পৃথিবী তার সমস্ত সংবাদ প্রকাশ করবে।

    §  এই আয়াতটি অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে জীবনের অসংখ্য কাজ করে। কোথাও নামাজ পড়ে, কোথাও সদকা করে, কোথাও কারও উপকার করে; আবার কোথাও অন্যায় করে, কারও অধিকার নষ্ট করে বা গুনাহে লিপ্ত হয়।

    §  সেদিন পৃথিবী আল্লাহর অনুমতিতে তার ওপর সংঘটিত কর্মকাণ্ডের সাক্ষ্য দেবে।

    §  রাসুলুল্লাহ সা. এই আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পৃথিবীর সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

قَرَأَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ هَذِهِ الْآيَةَ: ﴿يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا﴾ قَالَ: «أَتَدْرُونَ مَا أَخْبَارُهَا؟» قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: «فَإِنَّ أَخْبَارَهَا أَنْ تَشْهَدَ عَلَى كُلِّ عَبْدٍ أَوْ أَمَةٍ بِمَا عَمِلَ عَلَى ظَهْرِهَا، تَقُولُ: عَمِلَ يَوْمَ كَذَا كَذَا وَكَذَا، فَهَذِهِ أَخْبَارُهَا».

    হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন: “সেদিন পৃথিবী তার যাবতীয় সংবাদ বর্ণনা করবে।” এরপর তিনি বললেন, “তোমরা কি জানো, পৃথিবীর সংবাদ কী?” সাহাবীগণ বললেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত।” তিনি বললেন, “পৃথিবীর সংবাদ হলো, পৃথিবীর পৃষ্ঠে প্রত্যেক নর-নারী বান্দা যে আমল করেছে, পৃথিবী তার বিরুদ্ধে সে বিষয়ে সাক্ষ্য দেবে। পৃথিবী বলবে, অমুক ব্যক্তি অমুক দিনে এই এই কাজ করেছে। এটাই হলো তার সংবাদ।” (জামে তিরমিযি: ৩৩৫৩)

    §  কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ বলেন:

﴿ٱلْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَىٰٓ أَفْوَٰهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَآ أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُم بِمَا كَانُوا۟ يَكْسِبُونَ﴾

    “আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব; তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা সাক্ষ্য দেবে তারা যা অর্জন করত সে সম্পর্কে।” (সূরা ইয়াসিনঃ ৬৫)

    §  অর্থাৎ সেদিন মানুষের নিজের শরীরও তার কাজের সাক্ষী হয়ে যেতে পারে। দুনিয়াতে মানুষ কোনো কাজ ভুলে গেলেও আল্লাহর কাছে তা ভুলে যাওয়া হয় না।

আয়াত-৫

بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَىٰ لَهَا কারণ তোমার রব তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।

    §  পৃথিবী নিজের ইচ্ছায় এসব সংবাদ প্রকাশ করবে না। আল্লাহর নির্দেশেই পৃথিবী মানুষের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে।

    §  এখানে আল্লাহর অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে।

    §  আল্লাহ বলেন:

﴿أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلْخَبِيرُ﴾

    “তিনি কি জানেন না, যিনি সৃষ্টি করেছেন? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-মুলকঃ ১৪)

    §  আরও বলেন:

﴿يَعْلَمُ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُسِرُّونَ وَمَا تُعْلِنُونَ ۚ وَٱللَّهُ عَلِيمٌۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ﴾

    “তোমরা যা প্রকাশ করো এবং যা গোপন করো-আল্লাহ তা সবই জানেন।” (সূরা আত-তাগাবুনঃ ৪)

    §  অতএব মানুষের কাছ থেকে কোনো বিষয় গোপন করা সম্ভব হলেও আল্লাহর কাছ থেকে কোনো কিছুই গোপন করা সম্ভব নয়।

আয়াত-৬

يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِّيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ সেদিন মানুষ বিভিন্ন দলে বের হবে, যাতে তাদের নিজেদের আমল তাদের দেখানো হয়।

    §  কিয়ামতের দিন মানুষ তার নিজের আমলের বাস্তব ফলাফল দেখতে পাবে। দুনিয়াতে মানুষ অনেক কাজ করে পরে ভুলে যায়। কোনো কাজকে তুচ্ছ মনে করে, কোনো কাজের কথা মনে রাখে না। কিন্তু আল্লাহর কাছে মানুষের কোনো আমল হারিয়ে যায় না।

    §  আল্লাহ বলেন:

﴿وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَٰذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا ۚ وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا ۗ وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا﴾

    “আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তখন অপরাধীরা তাতে যা আছে তার কারণে ভীত হবে এবং বলবে, ‘হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! এ কেমন আমলনামা, যা ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি; বরং সবকিছুই গণনা করে রেখেছে!’” (সূরা আল-কাহফঃ ৪৯)

    §  রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ

لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ، وَعَنْ عِلْمِهِ فِيمَ فَعَلَ، وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَعَنْ جِسْمِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ

    “কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা দুটি একটুও সরবে না, যতক্ষণ না তাকে কয়েকটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে: ১. তার জীবন সম্পর্কে—কী কাজে সে তা অতিবাহিত করেছে। ২. তার জ্ঞান সম্পর্কে—সে তার জ্ঞান অনুযায়ী কী আমল করেছে। ৩. তার সম্পদ সম্পর্কে—কোথা থেকে তা উপার্জন করেছে এবং কোথায় তা ব্যয় করেছে। ৪. তার শরীর সম্পর্কে—কী কাজে সে তার শরীরকে ক্ষয় করেছে।” (আবু বারযাহ আল-আসলামী রা. থেকে বর্ণিত, জামে তিরমিযিঃ ২৪১৭)

    §  অর্থাৎ জীবন, সময়, সম্পদ ও অন্যান্য নিয়ামত-সবকিছুর ব্যাপারেই মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে।

আয়াত-৭

فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ অতএব কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলেও সে তা দেখতে পাবে।

    §  এখানে আল্লাহ মুমিনের জন্য আশার একটি দরজা খুলে দিয়েছেন। মানুষের কাছে কোনো ভালো কাজ যতই সামান্য মনে হোক, আল্লাহর কাছে তা অমূল্য হতে পারে।

    §  আল্লাহ বলেন:

﴿مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَن جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ﴾

    “যে ব্যক্তি একটি সৎকাজ নিয়ে আসবে, তার জন্য তার দশগুণ রয়েছে।” (সূরা আল-আনআমঃ ১৬০)

    §  রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ

اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ

    “জাহান্নাম থেকে বাঁচো, যদিও অর্ধেক খেজুর দান করার মাধ্যমে হয়।” (বুখারি ও মুসলিম)

    §  এ থেকে বোঝা যায়, ছোট একটি দান, সুন্দর একটি কথা, কারও কষ্ট দূর করা কিংবা কোনো ভালো কাজে সহযোগিতা করা-এসবকে তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়।

আয়াত-৮

وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ আর কেউ অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করলেও সে তা দেখতে পাবে।

    §  শেষ আয়াতে সূরাটি মানুষকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সতর্কতা দিয়েছে। যেমন সামান্য ভালো কাজ হিসাবের মধ্যে থাকবে, তেমনি সামান্য মন্দ কাজও হিসাবের মধ্যে আসবে।

    §  আল্লাহ বলেন:

﴿وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍۢ شَرًّۭا يَرَهُۥ﴾

    “আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে।” (সূরা আল যিলযালঃ ৮)

    §  আর সূরা কাহফে বলা হয়েছেঃ

﴿لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا﴾

    §  “ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি; বরং সবকিছুই গণনা করে রেখেছে।” (সূরা আল-কাহফঃ ৪৯)

    §  তাই কোনো গুনাহকে শুধু ছোট মনে করে অবহেলা করা ঠিক নয়। তবে গুনাহ হয়ে গেলে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়াও যাবে না। বরং সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে ফিরে আসতে হবে।

    §  আল্লাহ বলেন:

﴿قُلْ يَـٰعِبَادِىَ ٱلَّذِينَ أَسْرَفُوا۟ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا۟ مِن رَّحْمَةِ ٱللَّهِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغْفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ﴾

    “নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।” (সূরা আয-যুমারঃ ৫৩)

    §  অর্থাৎ এই আয়াত মানুষকে শুধু ভয় দেখায় না; বরং নিজের জীবন সংশোধনের জন্য সতর্ক করে।

 

সূরা আল যিলযাল থেকে শিক্ষা:

১. কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী-তাই আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে হবে।

২. দুনিয়ার জীবন স্থায়ী নয়-সম্পদ, বাড়ি, ক্ষমতা ও দুনিয়ার সবকিছু একদিন শেষ হয়ে যাবে।

৩. আল্লাহর কাছ থেকে কোনো কাজ গোপন নয়-মানুষ না দেখলেও আল্লাহ সব দেখেন।

৪. পৃথিবী ও মানুষের শরীরও সাক্ষী হতে পারে-তাই গোপনেও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

৫. প্রতিটি আমলের হিসাব হবে-জীবনের কোনো কাজই অর্থহীনভাবে হারিয়ে যাবে না।

৬. ছোট নেক আমলকে অবহেলা করা যাবে না-সামান্য ভালো কাজও আখিরাতে মূল্যবান হতে পারে।

৭. ছোট গুনাহকেও তুচ্ছ মনে করা যাবে না-কারণ সামান্য মন্দ কাজও আমলনামায় লিপিবদ্ধ হয়।

৮. গুনাহ হয়ে গেলে তওবা করতে হবে-আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না।

৯. নিজের আমলের হিসাব নিজেকেই নিতে হবে-কিয়ামতের হিসাবের আগে দুনিয়াতেই নিজের জীবন পর্যালোচনা করা উচিত।

১০. জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান মনে করতে হবে-কারণ একদিন আমাদের নিজেদের আমলই আমাদের সামনে উপস্থিত হবে।

 

পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,

    §  সূরা আল যিলযাল আমাদের সামনে কিয়ামতের একটি শক্তিশালী চিত্র তুলে ধরে। পৃথিবী কাঁপবে, পৃথিবী তার সংবাদ প্রকাশ করবে এবং মানুষ তার নিজের আমল দেখতে পাবে।

    §  তাই আজ থেকেই আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজ সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত।

    §  ছোট বলে কোনো নেক আমল ছেড়ে দেব না, আর ছোট বলে কোনো গুনাহকে হালকা মনে করব না।

    §  আল্লাহ আমাদের সকলকে কিয়ামতের দিনের হিসাব সহজ করুন এবং আমাদের আমলনামা নেক আমলে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।

 

জ্ঞাতব্য:

নোটটি সোস্যাল মিডিয়াতে সংগৃহিত ও সম্পাদিত।

 

 


No comments:

Post a Comment

আমার প্রিয় বাংলা বই-এর যে কোন লেখাতে যে কোন ত্রুটি বা অসংগতি পরিলক্ষিত হলে দয়া করে আমাদের লিখুন।